সতর্কবার্তা: এই অডিও স্টোরিটি হেমেন্দ্রকুমার রায়ের বিখ্যাত ক্লাসিক হরর ঘরানার একটি রোমাঞ্চকর কাহিনী। এর গা ছমছমে পরিবেশ এবং ভূতুড়ে আবহ শ্রোতাদের মনে গভীর আতঙ্ক জাগাতে পারে, তাই দুর্বল হৃদয়ের অধিকারীদের এটি সাবধানে শোনার অনুরোধ করা হচ্ছে।
কীতান্তপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা ও স্টেশন মাস্টারের সতর্কবার্তা
রহস্য আর অ্যাডভেঞ্চারে ভরা এক অন্ধকার রাত্রির পটভূমি। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বা লেখক নিজে কাজের সন্ধানে পাড়ি জেমেন এক অচেনা ও থমথমে জনপদ—কীতান্তপুরের উদ্দেশ্যে। স্থানীয় এক প্রভাবশালী জমিদারের কাছ থেকে চাকুরির পাকা কথা পেয়ে তিনি ট্রেন চড়ে কীতান্তপুর স্টেশনে এসে নামেন। কিন্তু ট্রেন থেকে নামার পরই অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তিনি। স্টেশনের স্টেশন মাস্টার লেখকের গন্তব্য ও জমিদারের নাম শুনে শিউরে ওঠেন এবং তাকে কষে নিষেধ করেন সেই জমিদার বাড়িতে না যাওয়ার জন্য। স্টেশনের মাস্টারের মুখের সেই ভয়ের ছাপ এবং বারংবার বারণ সত্ত্বেও নিজের জেদ ও প্রয়োজনে লেখক আর পিছু হটেন না; তার সাথে থাকা একমাত্র বিশ্বস্ত সঙ্গী হলো তার আদরের পোষ্য কুকুর—রোভার।
জমিদার বাড়ির ভাঙাচোরা রূপ ও রহস্যময় জমিদার
স্টেশন থেকে বহু কষ্টে পথ পেরিয়ে যখন লেখক কীতান্তপুরের সেই প্রাচীন জমিদার বাড়িতে এসে পৌঁছান, তখন তার চোখ কপালে ওঠে। প্রাসাদোপম সেই বাড়িটি বলতে গেলে এখন একটি ভগ্নপ্রায় ও ভাঙাচোরা দালান, যার আনাচে-কানাচে কোনো আলোর লেশমাত্র নেই, ঘুটঘুটে অন্ধকার গ্রাস করে আছে পুরো চত্বর। মনে প্রশ্ন জাগে, এমন জীর্ণ দশার একজন জমিদার কীভাবেই বা তাকে চাকরি দেবেন! কিন্তু সমস্ত সংশয় কাটিয়ে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর তিনি সেই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। রাতে জমিদারের সাথে তার দেখা হয়। সেই কীতান্তপুরের জমিদার কোনো সাধারণ মানুষ নন—তার চেহারা দেখলেই পলেস্তারা খসা দেওয়ালের মতো রোগা, শুকনো, চোখ দুটো কোটরে বসা এবং জলজলে দৃষ্টি দেখলে যেকোনো মানুষের মেরুদণ্ডে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাবে। জমিদার তাকে থাকার জন্য একটা ঘর দেন এবং যাওয়ার সময় কঠোর নির্দেশ দিয়ে যান যে, রাতের বেলা যেন কোনোক্রমেই তার কুকুরটাকে খাটের ওপর উঠতে দেওয়া না হয়।
রাতের বিভীষিকা ও রোভারের ওপর আক্রমণ
জমিদারের সেই অদ্ভুত নিষেধের কথা মাথায় থাকলেও, কুকুর রোভারকে নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন লেখক। তাই তিনি রোভারকে নিজের সাথেই খাটের ওপর শুইয়ে রাতের গভীরে ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু ঠিক মাঝরাতে হঠাৎ করে এক অদ্ভুত ও দমবন্ধ করা পরিস্থিতে তার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি টের পান কেউ যেন অত্যন্ত শক্তহাতে তার নিজের গলা পেঁচিয়ে ধরে চেপে ধরছে! কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অদৃশ্য হাতের চাপ সরে যায়, আর ঠিক তখনই পাশের অন্ধকার থেকে ভেসে আসে রোভারের বুকফাটা আর্তনাদ ও চিৎকার। চমকে উঠে লেখক টর্চ জ্বেলে দেখেন রোভার ঘরে নেই!
হাড়গোড়ের ঘর এবং কবরস্থানের ভুতুড়ে আড্ডা
ভয়ে বুক কেঁপে উঠলেও লেখক পাগলের মতো সারা বাড়ি খোঁজা শুরু করেন রোভারকে উদ্ধার করার জন্য। খুঁজতে খুঁজতে তিনি সেই ঘরেরই একটা বন্ধ দরজার পেছনে পৌঁছান এবং দরজা ঠেলে ভেতরে যা দেখেন, তাতে তার আত্মার রাম নাম বেরিয়ে যায়। তিনি দেখতে পান, ঘরের এক কোণে স্তূপীকৃত হয়ে পড়ে রয়েছে অসংখ্য মানুষের হাড়গোড় এবং এক ভয়ানক রক্তাক্ত ও বীভৎস দৃশ্য! শুধু তাই নয়, সেই ঘরের ভাঙা জানলার বাইরে তাকালে স্পষ্ট দেখা যায় এক গা ছমছমে কবরস্থান, যেখানে গভীর রাতে পিশাচ ও ভূতের দল মেতে ওঠে তাদের পৈশাচিক আড্ডা।
চাঞ্চল্যকর সত্য ও জমিদারের করুণ পরিণতি
তীব্র আতঙ্ক এবং হুলস্থুল কাণ্ডের পর অবশেষে রোভার অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসে এবং স্থানীয় লোকজন ও উদ্ধারকারীরা ছুটে এসে লেখককে সেই অভিশপ্ত কুঠুরি থেকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসে। আর তখনই দিনের আলো ফোটার সাথে সাথে উন্মোচিত হয় এক চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক সত্য—খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, কীতান্তপুরের সেই অদ্ভুত ও ভয়ংকর জমিদার বেঁচে নেই; তার মৃতদেহটি বহুক্ষণ আগেই রহস্যজনকভাবে সিঁড়ির নিচে পড়ে রয়েছে! ক্লাসিক বাংলা ভূতুড়ে গল্পের এই নিখুঁত মারপ্যাঁচ আর রোমাঞ্চ আপনার রাতের ঘুম কেড়ে নিতে বাধ্য।