সতর্কবার্তা: এই পোস্টটি শুধুমাত্র বিনোদনের উদ্দেশ্যে তৈরি। রাজশেখর বসুর বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম “ভূশণ্ডির মাঠে” গল্পের রসবোধ ও অডিও রূপান্তরের আবহ ফুটিয়ে তোলার জন্যই এই আয়োজন।
সংসারের জ্বালা থেকে ভূশণ্ডির মাঠের ধূলি
সংসারের যাতাকলে পিষ্ট হওয়া ছাপোষা মানুষের জীবন যে কতটা দুর্বিষহ হতে পারে, তার নিখুঁত ও হাসিখুশি অথচ শ্লেষাত্মক রূপায়ন হলো শিবুর জীবন। গ্রামের সাধারণ এক কোণে মেজোখাটে সংসার পাতা শিবুর কপালে সুখ কোনোদিনই জোটে না। তার ওপর তার গিন্নি, নেত্যকালীর সাথে তার বনিবনা তো দূরের কথা, কথা কাটাকাটিই ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। একদিন সেই ঝগড়ার পারদ চরমে পৌঁছালে নেত্যকালী সোজাসুজি শিবুর পিঠে এমন এক সজোরে ঝাঁটার বাড়ি বসিয়ে দেয় যে, অপমানে আর অভিমানে শিবুর মাথা ঘুরে যায়। সে মনে মনে পণ করে, এই নরককুণ্ড মার্কা সংসার আর সে করবে না—সোজা কলকাতা চলে যাবে। যেমন কথা তেমনি কাজ। কিন্তু নিয়তির কি অদ্ভুত পরিহাস! কলকাতায় পৌঁছানোর পর ভিনদেশি উল্টোপাল্টা খাবার খেয়ে পেটের মারাত্মক গোলমাল বাধে, আর ভেদবমি ও কলেরার মতো মায়ায় পড়ে বেচারা শিবু একসময় মারা যায়। সংসারের ঝামেলা চুকেবুকে সে সোজা গিয়ে হাজির হয় ভূতদের সেই বিখ্যাত আড্ডাখানা—’ভূশণ্ডির মাঠে’।
ভূশণ্ডির মাঠের অদ্ভূত সব বাসিন্দারা
যে মাঠের নাম শুনলেই মানুষের রক্ত হিম হয়ে যাওয়ার কথা, সেই ভূশণ্ডির মাঠ আসলে মৃত আত্মাদের এক জমজমাট মিলনমেলা। এই অলৌকিক দুনিয়ায় পা রেখেই শিবুর সাথে পরিচয় হয় অদ্ভুত সব সহকর্মী ভূতের সাথে। তাদেরই একজন হলো কারিয়া প্রেত। বেঁচে থাকার দিনে সে নাকি কোনো এককালে বিহারী ছিল এবং মাথায় ভারী কোনো কলকবজা বা পাথর চাপা পড়ে করুণভাবে মারা গিয়েছিল। তার কথা বলার ঢং আর মুখের ভাষা শুনলে হাসি পাবে না এমন সাধ্য কার! আর একজনের সাথে পরিচয় হয়, সে হলো নাদু মল্লিক। একসময়ে সে ছিল প্রতাপশালী এক দারোগা, যার নাম শুনলে হুগলি, রিসরা আর শ্রীরামপুর এলাকার মানুষ থরথর করে কাঁপত। বেঁচে থাকার সময় যার ভয়ে জগত প্রকম্পিত হতো, আজ সেই নাদু মল্লিক ভূশণ্ডির মাঠের ধুলোয় আর পাঁচটা সাধারণ ভূতের মতো আড্ডা দিয়ে দিন কাটায়।
ভূতের আসরে গানবাজনা ও শিবুর নতুন রোমাঞ্চ
জীবনের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মারা গেলেও শিবুর মনের গভীরে সুপ্ত রোমান্স বা শখগুলো এতটুকুও মরেনি। এই অদ্ভুত ভূতের দুনিয়ায় এসে কারিয়া প্রেত আর সাবেক দারোগা নাদু মল্লিকের সাথে মিলে জমে ওঠে এক দারুণ আসর। মাঠের মাঝখানে জড়ো হয়ে তারা তিনজনে মিলে শুরু করে দিল উদ্দাম গানবাজনা আর হইচই। সেই হাসাহাসি আর আড্ডার মাঝেই হঠাৎ করে শিবুর মাথায় এক অদ্ভুত খেয়াল চাপল। সে চারপাশে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে ভাবতে লাগল, বেঁচে থাকতে তো শান্তির মুখ দেখলাম না, বউয়ের ঝাঁটার বাড়ি খেয়ে মরলাম—তাহলে এখন এই ভূতের দেশে এসেও কি চিরকাল একা থাকতে হবে? আমার কি আর একবার বিয়ে করা দরকার নেই? যেমন ভাবনা, অমনি কাজ! ভূশণ্ডির মাঠের সেই ভুতুড়ে পরিবেশেই সে কোমর বেঁধে লেগে পড়ে এক পেত্নীকে পছন্দ করতে এবং শেষ পর্যন্ত ঘটিয়ে ফেলে এক অভাবনীয় ভূতুড়ে বিয়ে!
এক অন্যরকম অনুভূতির গল্প
রাজশেখর বসুর কলমে সমাজের নানা অসঙ্গতি, মানুষের স্বভাব এবং মৃত্যুর পরবর্তী কাল্পনিক জগত যেভাবে হাসির মোড়কে ফুটে উঠেছে, তা বাংলা সাহিত্যে এক বিরল নিদর্শন। এই অডিও রূপান্তরটিতে সেই ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ আর ভূতুড়ে মেজাজকে জীবন্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কান পাতলে আজও যেন শোনা যায় কারিয়া প্রেতের ভিনদেশি বুলি, নাদু মল্লিকের দাপুটে গলার স্বর আর শিবুর নতুন সংসার পাতার ফন্দিফিকির।
আমাদের এই ছোট্ট প্রয়াস আপনাদের কেমন লাগলো, তা আমাদের জানান। পুরোনো দিনের সেই ক্লাসিক রসবোধকে সাথে নিয়ে ভুতুড়ে কাহিনীর এই আসরে আপনাদের সবাইকে আমন্ত্রণ জানাই।
